![]() |
| ছবি: এআই দিয়ে তৈরি |
প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশিতে আবারও শুরু হয়েছে এক নীরব কিন্তু বিধ্বংসী আলোড়ন। ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠ। এর হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে বহুল আলোচিত জলবায়ু চক্র ‘এল নিনো’ (El Niño)। স্প্যানিশ ভাষায় শব্দটির অর্থ ‘ছোট ছেলে’। ষোড়শ শতাব্দীতে দক্ষিণ আমেরিকার জেলেরা প্রথম সমুদ্রের এ অস্বাভাবিক উষ্ণ জলের স্রোতের বিষয়টি খেয়াল করেছিলেন। এটি মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র হলেও বর্তমানের মাত্রাতিরিক্ত উষ্ণ পৃথিবীতে এর আগমন এক অশনিসংকেত। সম্প্রতি জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এল নিনো নিয়ে ২০২৬ সালের জুন মাসে এক বিস্তারিত ও হালনাগাদ সতর্কতা জারি করেছে, যা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের কড়া সতর্কতা
জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে এল নিনো পরিস্থিতি পুরোপুরি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ। আর অন্তত নভেম্বর মাস পর্যন্ত এ পরিস্থিতি বিরাজ করার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি।
মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ভূপৃষ্ঠের নিচের দিকের জলের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৬°C পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি বিশাল তাপের আধার হিসেবে কাজ করে পৃষ্ঠের জলকে আরও উত্তপ্ত করছে। ডব্লিউএমও-র মতে, এবারের এল নিনো মাঝারি থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী মাত্রার হতে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, এটা খুবই স্পষ্ট এল নিনো আগামী মাসগুলোতে ৯০ শতাংশ নিশ্চয়তার সাথে আমাদের দোরগোড়ায় এসে হাজির হচ্ছে। এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবেই নিতে হবে। এল নিনো একটি উষ্ণতর বিশ্বের জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে।
বিশ্বজুড়ে ও দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভাব্য প্রভাব
এল নিনোর প্রভাবে সাধারণত বৈশ্বিক তাপমাত্রার পারদ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে এবং আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা চরম আকার ধারণ করে। ট্রেড উইন্ড বা আয়ন বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে একদিকে যেমন তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভয়াবহ খরা দেখা দেয়, অন্যদিকে দেখা দেয় অতিবৃষ্টি ও প্রলয়ংকরী বন্যা। দক্ষিণ আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল এবং হর্ন অব আফ্রিকায় বৃষ্টিপাত বাড়লেও অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কিছু অংশে খরার মারাত্মক প্রকোপ দেখা যায়।
বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এল নিনোর প্রভাব বেশ উদ্বেগজনক। ডব্লিউএমও-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কম হতে পারে। এর ফলে কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলে সেচের জলের তীব্র অভাব দেখা দেবে। ফসলের ফলন কমে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহের শঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য ও পানি নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকিস্বরূপ।
জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর যুগলবন্দী
এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক চক্র, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ফিরে আসে। কিন্তু মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী এমনিতেই ভয়াবহ জ্বরে ভুগছে। ডব্লিউএমও-র সেক্রেটারি-জেনারেল সেলেস্ট সাউলো জানিয়েছেন, ২০২৩-২০২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনো এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে ২০২৪ সাল ইতোমধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, নতুন এ এল নিনোর কারণে ২০২৭ সাল নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়নের যুগের চেয়ে সাময়িকভাবে ১.৫°C বেশি হতে পারে।
প্রস্তুতি ও আগামীর করণীয়
প্রকৃতির রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার কোনো জাদুকরী উপায় আমাদের হাতে নেই। তবে এর প্রভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব। কৃষি, স্বাস্থ্য, পানিসম্পদ ও জ্বালানি খাতকে চরম আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতিসংঘের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া ছাড়া এ সংকট মোকাবিলার আর কোনো বিকল্প নেই। এল নিনো যখন সারা বিশ্বে দাবদাহ আর খরার রাজত্ব কায়েম করতে চলেছে, তখন প্রতিটি রাষ্ট্রের উচিত সবার জন্য আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

0 Comments